
মোহাম্মদ তারেক
সিনেমা দেখা ছিল যার সখ । সেই সখটা একটা সময় নেশায় পরিণত হয়েছিল তাঁর । সিনেমার অধিকাংশই গানই তাঁর মুখস্থ ছিল। গানের মিউজিক শুনেই গানের কথা আর সুর আওড়াতে পারতেন লুৎফর । সিনেমার পোকা ছিলেন তিনি। নতুন কোনো সিনেমা মুক্তি পেলেই ছুটে যেতেন হলে। ছবি দেখতে দেখতে কখন যে ছবিপাড়ার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন তা নিজেও জানতেন না । ছবি দেখা , ছবি তোলা ছিল তাঁর প্রচন্ড নেশা। তখন চারদিকে ছবি তোলার কারবারি হিসেবে নাম ডাকও বেশ ছিল লুৎফরের ।গোরাবাজারে বড় বড় দোকানের মালিকরা তাদের ছেলেমেয়েদের ছবি তোলার জন্য তাকে ডাকা হতো । ক্যামেরায় সাটার টিপে ছেলে মেয়েদেরকে ফিল্মে বন্দি করতেন তিনি । তাঁর তোলা সেই ছবি দেখে সবাই বাহবা দিতেন । কলকাতায় প্রায়ই যাওয়া আসা ছিল তাঁর । হঠাৎ একদিন সিনেমা কোম্পানীর উমারীর সাথে দেখা হয় লুৎফরের । উমারী তাকে জানালেন , তাদের দুই সিনেমার কাজ শুরু হয়েছে।

একটি বাংলা, অন্যটি হিন্দি। ছবির নাম ‘ মৃত্যু ক্ষুধা ‘ ও ‘মউত কি আরজু ‘ । এজন্য পছন্দের তিন-চারজন লোক তাদের প্রয়োজন ছিল । তাদের কোম্পানীর খরচে থাকা-যাওয়া-আসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । তারমধ্যে একজন ছিলেন লুৎফর রহমান। নির্ধারিত দিনে তিনি টালিগঞ্জে কালি ফিল্ম স্টুডিওতে পাড়ি জমালেন । সেখানে একটি সিনেমার শুটিং চলছিল । এ যেন অন্য এক জগতে পা রাখলেন লুৎফর রহমান। আলোর ঝলমলে লাইট, ক্যামেরা, অ্যাকশন , কাট —-শব্দ কথাগুলো যেন মনের ভেতরে গেঁথে ছিল তাঁর । পর্দায় ভেসে ওঠা সুন্দরী নায়িকাকে বাস্তবে কাছে দেখে অভিভূত হলেন লুৎফর । নায়িকার সাথে কথা বলে নিজেকে নায়ক নায়ক ভাব অনুভব করলেন তিনি । নায়ক নাসির উদ্দিন খান লুৎফরকে পরামর্শ দিলেন ১০/১৫ বিঘা জমি বিক্রি করে ছবি বানানোর জন্য । তার কথা শুনে অবাক লুৎফর রহমান।

মাথা যেন গাছ ভেঙে পড়ার মতো। নাসির উদ্দিন খানের সঙ্গে লুৎফরের খুব ভাল একটা সম্পর্ক ছিল। সুদর্শন নাসিরউদ্দিন খান ছবিপাড়ার সফল নায়ক হতে না পারলেও তিনি সাধারণ জনগণের মনে নায়ক হতে পেরেছিলেন। কারণ পরবর্তী সময়ে তিনি ভারতের লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান আমলে একবার তিনি এখানে এসেছিলেন। সেই সময় তিনি লুৎফরকে খুঁজে বের করে গল্প – আড্ডায় অতীতের কথা স্মরণ করেছিলেন। সিনেমার শুটিং স্পষ্ট। ছবির পরিচালক ছিলেন সারোয়ার। তিনি লুৎফর রহমানের বিশেষ পরিচিত ছিলেন । বহরমপুর মুসলিম পাড়ায় তার বাড়ি। ছবির নায়িকা সাধনার বাড়ি বরিশাল জেলায় । শুটিং ইউনিটের একটি কক্ষে শ্রীমতি প্রডাকশনের কর্ণধার কানন দেবীর সাথে দেখা হয় লুৎফর রহমানের। তাকে দেখে সত্যিই অভিভূত হলেন তিনি। কথা বললেন তার সাথে। প্রডাকশন বয়কে চা দিতে বললেন কানন দেবী । লুৎফরের চায়ের কাপটা ফাটা দেখে তিনি হেসে বললেন, কিছু মনে করবেন না। প্রডাকশনের চা-তো….। একজন অ্যাসিসটেন্ট ক্যামেরাম্যান ছিলেন , তার নাম সাধন রায়। মানুষটা দেখতে কালো ছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল পূর্ব বাংলার চট্টগ্রাম জেলায় জেলায়। তিনি লুৎফরের পরিচিত বন্ধু, হিতার্থী ছিলেন । সেই সময় তিনিও শুটিংয়ে ছিলেন।

স্টুডিওর ফ্লোর থেকে বেরিয়ে আসার সময় তিনি দেখলেন , একজন কানন দেবীকে তার ওই ছবিতে তাকে একটু অভিনয়ের সুযোগ দেওয়ার জন্য বললেন , তাঁর নাম জহর রায়। কমিডিয়ান চরিত্র তার পছন্দ। কিন্তু কানন দেবী তাঁর চলতি ছবিতে সুযোগ হবে না বলে জানিয়ে সান্ত্বনা বাণী শোনালেন, আগামী ছবিতে তোমার জায়গা রাখবো। জহর রায় হয়তো নিজেই এ ঘটনা ভুলে গেছেন। ছবি পাড়ায় অনেক ঘটনাই ঘটে। তারপর লুৎফর ফিরে এলেন মুর্শিদাবাদে । গোরাবাজারের ফিল্ম কোম্পানীর দায়িত্ব নিলেন হিরো নাসির খান। অফিসের চা নাস্তা ছিল ফ্রি । টাকা দেয় গৌরী সেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হলো না ফিল্ম কোম্পানীর। এলাকার লোকজনের টাকা মেরে তাঁরা পালিয়ে গেলেন । শেষ পর্যন্ত নায়ক নাসির খান পর্দার নায়ক না হয়ে এক রমণীকে বিয়ে করে সংসার ধর্মে মন দিলেন।
সেই সময় টালিগঞ্জের সবাই লুৎফর রহমানকে লুথু দা বলে ডাকতেন । লুৎফর পেশা হিসেবে হাতে তুলে নিলেন বক্স ক্যামেরা। ছবি পাড়ায় স্টিল ফটোগ্রাফি করতেন তিনি । বোম্বে থেকে আসা নায়ক নায়িকাদের ছবি তুলতেন। ছবি , ছবি , আর ছবি । ছবি তোলাই ছিল তার জীবন। অসংখ্য দুর্লভ ছবি তুলেছিলেন এই প্রথিতযশা আলোকচিত্র শিল্পী। একটা সময় রাজনীতির সাম্প্রদায়িক ঝড় লুৎফরকে রাজশাহী নিয়ে এলো। মুর্শিদাবাদে তিনি দেখা করলেন শোচিন মিত্রের সঙ্গে। পেশায় তিনিও একজন ফটোগ্রাফার ছিলেন । তখন রাজশাহী ছিল লুৎফরের কাছে নতুন এক শহর। শহরের মানুষগুলো অচেনা। তেমন কাউকে তিনি চিনতেন না । এনালগ ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে লক্ষ্যহীনভাবে শহরে ঘুরে বেড়াতেন এগলি থেকে ওগলি । একেক করে সেখানকার লোকজনের সাথে তাঁর পরিচয় হয় , কথা হয় । রাজশাহীতে তিনিই একমাত্র মুসলমান ফটোগ্রাফার ছিলেন । ফলে সময়ের ব্যবধানে ঘরে ছবি তোলার জন্য তাঁর ডাক পড়তো । পরিবারের সদস্যদের ছবি তুলতেন।

একদিন লুৎফরের ডাক এলো চলচ্চিত্র নায়িক চিত্রা সিনহার বাড়ি থেকে। তিনি হাজির হলেন চিত্রা সিনহার বাড়িতে। সেখানে অনেক মানুষের সমাগম । খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল । নায়িকা চিত্রা সিনহা লুৎফর রহমানকে জানালেন, এখানে কয়েকজন মেয়ে আসবে। আপনি তাদের প্রত্যেকের তিন পোজের ছবি তুলবেন। নায়িকার কথামত মেয়েদের ছবি তুললেন তিনি । সেই সময় ঢাকা থেকে ছবি পাড়ার লোকজনেরা প্রায়ই আসতেন গল্প করতে, আড্ডা দিতে , ছবি তুলতে । তাদের মধ্যে সৈয়দ আউয়াল, কাজী নজরুল, সাধন রায় ও শহিদুল আমিন অন্যতম ছিলেন। সৈয়দ আউয়ালকে লুৎফরকে চিনলেন । সাধন রায় লুৎফর রহমানকে দেখে বললেন, আমরা বড়মাপের একজন ক্যামেরাম্যান পেলাম। আপনি ঢাকায় চলে আসুন। সেখানে অনেক কাজ। আমিও ঢাকায় আছি । বেশ কয়েকটি ছবির কাজ করছি। আপনি এসে সেগুলোতেও কাজ করতে পারবেন।
ছবিপাড়ার নুতন দিগন্ত উন্মোচনের এক হাতছানি ফিরাতে পারিনি লুৎফরকে ? তিনি চলে আসলেন রাজধানী ঢাকায়। উঠলেন সৈয়দ আউয়াল ভাইয়ের কমলাপুরের বাসায় ।সেখানেই ছিল তাঁর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা । তারপর ছবি পাড়ার লোকজনের সাথে পরিচয় হলো তাঁর । সেই সময় তিনি বেশ কিছু ছবির কাজ করলেন । হাতে যা টাকা-পয়সা আয় করলেন , তা দিয়ে মহাখালীর ওয়ারলেস গেটে একটি স্টুডিও গড়ে তুললেন লুৎফর রহমান । স্টুডিওর নাম রাখা হলো ” প্রতিচ্ছবি ” । সেই সময় এই ফটো স্টুডিওতে নায়ক – নায়িকা , পরিচালক, প্রযোজক, ক্যামেরাম্যান, শিল্পী, সংগীত পরিচালকদের আনা গোনা ছিল । সেখানে আড্ডা হতো, ছবি তোলা হতো । লুৎফর রহমান বলেছিলেন,
একদিন অজান্তা ফিল্মের সিনেমার শুটিং থেকে ফেরার সময় ছবির ক্যামেরাম্যান সাধন রায়, নায়ক আনোয়ার হোসেন ও শওকত আকবর নতুন এয়ারপোর্ট থেকে সারাটা পথ পায়ে হেঁটে তাঁরা মহাখালীর প্রতিচ্ছবি স্টুডিওতে এসেছিলেন । কোনো ক্লান্তি তাদেরকে স্পর্শ করতে পারেনি। ওই সময় মঞ্জুশ্রী বিশ্বাস প্রযোজিত “আলোর পিপাসা ” ছবির কাজ চলছিল গুলশান-২ এর একটি বাড়িতে । ছবির নায়ক ছিলেন শওকত আকবর । আর নায়িকা রোকসানা।
লুৎফর রহমানের ক্যামেরায় বন্দি হয়েছিলেন খান আতাউর রহমান, নায়ক রাজ রাজ্জাক, এহতেশাম, গহর জামিল, রওশন জামিল, হাসান ইমাম, পাকিস্তানের নায়িকা রোকসানা, চাষী নজরুল ইসলাম,আনোয়ার হোসেন, রহমান, আজিম, সুমিতা দেবী, খান জয়নুল, আলতাফ, শবনম , সুচন্দা, সুজাতা, শাবানা, কবরী, উজ্জল , ববিতা, ওয়াসিম, ফারুক, সোহেল রানা, আলমগীর সহ কিংবদন্তি মানুষ গুলো। অসংখ্য দুর্লভ ছবি তুলে ছিলেন প্রথিতযশা আলোকচিত্র শিল্পী লুৎফর রহমান । তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই ” প্রতিচ্ছবি ” ফটো স্টুডিওটি সন্তান আলোকচিত্র শিল্পী মোস্তাফিজুর রহমান মিন্টু হাত ধরে আজও দাঁড়িয়ে আছে ছবি পাড়ার নায়ক – নায়িকাদের স্মৃতি নিয়ে।